সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রিতে এক বিকেল

0
33

কলকাতার সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রি’তে যখন পৌছেছি, তখন দুপুর তিনটে’র মত হবে৷৷ মল্লিকবাজার থেকে পায়ে হেঁটে মাত্র পাঁচ-ছয় মিনিটের পথ৷৷
আসতে তেমন কোনো সমস্যা হয় নি।৷
মূল সড়ক থেকে হাতের ডানদিকে যেতেই, সিমেট্রির প্রবেশদ্বার ।
ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ১৭৬৭ সালে নির্মিত হয় ঐতিহাসিকভাবে বেশ পুরনো এই গোরস্থানটি।৷
এখন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া’র (এএসআই) রক্ষণাবেক্ষণে আছে এ স্থানটি।
অজস্র ইংরেজ আর ইউরোপীয়দের সমাধিস্থ করা হয়েছিল এখানে।৷
তাই, এটি ‘সাহেবি গোরস্তান’ নামেও সুপরিচিত।৷
অসংখ্য কবি, মনীষী, শিক্ষক এবং সৈনিকরা এখানে চিরশান্তিতে নিদ্রিত ৷৷
বেশ পুরোনো স্থাপত্য এবং সমাধিস্থলের কারণে, সিমেট্রি’টি ঐতিহাসিকভাবে বেশ বিখ্যাত।৷
তবে, দর্শনার্থীদের তুমুল আগ্রহের পেছনে আরো একটি গুরূত্বপূর্ণ কারণ আছে,
শোনা যায় যে, কবরস্থান হওয়ার আগে এ জায়গাটা ছিল জলাভূমি।
যার কারণে এখানকার স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ ও ঘন গাছপালার সমারোহের পাশাপাশি,
সমাধিস্থলের ছমছমে, বিষণ্ণ পরিবেশ মানুষের মনে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব ফেলেছে,
সৃষ্টি করেছে অশরীরী অস্তিত্বের ভয়াল সব গল্প।৷
ভারতের অন্যতম ভৌতিক স্থান হিসেবে, লোকমুখে বেশ সমাদৃত এটি।৷
জনশ্রুতি আছে যে, নিশীথ রাতে শত বছরের পুরনো আত্মারা এখনো জেগে উঠে সমাধিপ্রাঙ্গনে।
তাদের ক্রন্দন,অতৃপ্তির আক্ষেপ আর বিলাপের দীর্ঘশ্বাসে এখানকার পরিবেশ অভিশপ্ত ও ভারী হয়ে উঠে ।৷
শোনা যায়, সত্যজিৎ রায়ের লেখা ফেলুদা সিরিজের ‘গোরস্তানে সাবধান’ নিয়ে একটা ছবি বানিয়েছিলেন সন্দীপ রায়।
সেটার শুটিংও হয়েছিল এখানেই৷
শুটিং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একযোগে এমন কিছু ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন যে, এখানে পরবর্তীতে পা বাড়াতে আর কেউ সাহসই করেন নি৷৷
এ কারণে, ঐতিহাসিক স্থাপনার সুরক্ষা ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে, কর্তৃপক্ষ বিকেল পাঁচটার পর,
সিমেট্রি’র প্রবেশদ্বার বন্ধ করার নিয়ম চালু করতে বাধ্য হয়েছে।৷
তার মানে,
ঘড়িতে পাঁচটা বাজার আগেই, আমাকে সবকিছু একবার ঘুরে দেখে নিতে হবে৷৷
সিমেট্রি’র প্রবেশদ্বার দিয়ে যখন ভেতরে প্রবেশ করলাম, পরিবেশটা বেশ অন্যরকম ঠেকলো।৷
যেন জনাকীর্ণ শহরের বুকে একখানা জনবিরল, নির্জন ভূখন্ড।৷
ততক্ষণে রোদের তীব্র’তা অবশ্য বেশ কমে এসেছে। শীতের দুপুর।৷
কোমল, মোলায়েম সূর্যকিরণের সাথে শীতল বাতাসের প্রবাহ যেন শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছে৷
দর্শনার্থীর ঢল এই শীতের সময়ে খুব একটা থাকে না বললেই চলে।৷
যাক, ভালোই হল, আমি এমনিতেও বেশ নির্জনতাপ্রিয় মানুষ।৷ একাকী ঘুরে বেড়ানোটা বেশ উপভােগ করি ।৷
তার উপর, সমাধিস্থলের মত পবিত্র স্থানে, নির্জনতা বজায় থাকাই শ্রেয় বলে মনে করি আমি।৷
পুরনো দিনের অনেক সমাধি চোখে পড়ল।
বাম দিকের সরু পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করলাম,
দুই পাশে সারি সারি করে,অজস্র সমাধির উপর এপিটাফ বা সমাধি-লিপি সজ্জিত আছে।
তাতে মৃত’দের নাম আর জন্ম-মৃত্যুর সাল পরিষ্কার’ভাবে লেখা আছে।
পড়তে পড়তে মন ভাবাপ্লুত হয়ে উঠলো।।
পড়ন্ত বিকেলের আকাশে ধীরে ধীরে সূর্য’দেবতার বিদায়বার্তা ঘোষিত হচ্ছে।৷
সমাধিস্থম্ভের আড়ালে পড়ন্তবেলার সূর্যের আলোকরশ্মি বাঁধাগ্রস্থ হয়ে,
সেই আলোর প্রতিফলন পুরো সিমেট্রি জুড়ে তৈরী করেছে অদ্ভুত, বিচিত্র এক অনুভূতির দ্যোতনা।৷
অনুভব করলাম, বিদায়ী সূর্যের মতই সব বন্ধন ছিন্ন করে, একদিন এভাবেই মানুষকে ধরাধাম থেকে বিদায় নিতে হয়।৷ পড়ে থাকে না পাওয়ার আক্ষেপ, অতৃপ্তি, দুঃখ। ।
যুগ যুগ ধরে এটাই প্রকৃতির নিয়ম৷৷
রবি ঠাকুরের ভাষায়,
“যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,
আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে,
চুকিয়ে দেব বেচা কেনা,
মিটিয়ে দেব গো, মিটিয়ে দেব লেনা দেনা,
বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে”
সমাধি’গুলোর মাঝের সবুজ গালিচাস্বরূপ পথ ধরে হেঁটে ছবি তুলতে তুলতে, যুগপৎ বিষাদ ও আক্ষেপে মন হঠাৎ আচ্ছন্ন হয়ে গেলো।৷
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটা সমাধিফলকের দিকে চোখ পড়লো৷৷ সমাধিফলক’টা বেশ সুন্দর ও পরিপাটি৷৷ অন্য ফলকগুলোর সাথে কেমন যেন অদ্ভুত ভিন্নতা আছে এটার৷৷ ফলকে ছোট্ট করে, একটা গোলাপ ফুলের নকশা করা আছে৷ ।৷
কে জানে, কার বুকের ধন প্রিয় সন্তান কিংবা সুহৃদ প্রিয়জন এখানে ঘুমিয়ে আছে৷৷
বুকের মধ্যে কিরূপ দুঃখ, পীড়া আর শোকে মোচড় দিয়ে উঠলো ।৷
মন থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বৃহদারন্যক উপনিষদের
সেই প্রার্থনাবাণী বেরিয়ে এলো ,
“সর্বে ভবন্তু সুখিন, সর্বে সন্তু নিরাময়া,
সর্বে ভদ্রানি পশ্যন্তু, মা কশ্চিদ দুঃখ মাপ্নুয়াত, ওম শান্তি শান্তি শান্তি।”
ফলকটি পার করে, হাঁটতে হাঁটতে আরো অনেকদূর যেতেই খেয়াল করলাম,
ঘন গাছপালার কারণে সামনের দিকটায় আবছা অন্ধকার ও বেশ স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ বিরাজ করছে৷৷
ঝিঁঝি পোকার ডাক শুনতে পাচ্ছি৷৷
আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম, কোনো দর্শনার্থীই নেই৷৷
বুঝতে পারলাম, আনমনে হাঁটতে হাঁটতে অনেকদূরে চলে এসেছি,
কেন যেন অস্বস্তি বোধ হচ্ছে,
সত্যি বলতে ,
নিজের সাহসও উবে গেছে মনে হচ্ছে৷৷ শরীর ভারী বোধ হচ্ছে।৷
” ফিরতে হবে এবার”- – – আপনমনে বলে উঠলাম ।৷
হঠাৎ করে, আমার মাইগ্রেনের ব্যথাটা যেন অমানুষিকভাবে ফিরে এলো।৷
প্রচন্ড মাথা ব্যথায় চোখে ঝাপসা দেখছি, বমি বমি লাগছে, পা টলছে।৷
মাথা চেপে ধরে, টলতে টলতে মাটিতে বসে পড়লাম।৷ অসহ্য যাতনা হচ্ছে।৷
সাথে ওষুধও আনা হয়নি৷৷
এই অবস্থায় কি যে করি!!!
এভাবে কতক্ষণ কাটলো জানি না, কপালে যেন কারো কোমল, শীতল হাতের স্পর্শ পেলাম৷৷
“হ্যালো ব্রাদার!!! ”
সম্বোধন শুনে তাকিয়ে দেখলাম, বাদামী বর্ণের এক তরুণী আমার সামনে দাঁড়িয়ে।৷ মুখশ্রী’তে ফর্সা আভা।৷
কাঁধে হাত রেখে প্রাণখোলা হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, আমি অসুস্থ কিনা।৷
অবাক হলাম একটু।৷
মাথা নাড়িয়ে না বললাম আমি।৷ সত্যিই তো, মাথা ব্যথা একটু কমেছে, কিছুটা স্বস্তিবোধ হচ্ছে ৷৷
মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম,
“যাক!!! নির্জন সিমেট্রি’তে একখানা সাথী অবশেষে পাওয়া গেলো৷৷
তরুণীর পরিপাটি পোশাক’পরিচ্ছদ দেখে মনে হলো, বেশ বনেদী, সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে৷৷
আমাদের ভার্সিটির রিডিংরুমে, ঠিক এমনি ধাঁচের পোশাক পড়া বিখ্যাত ইংরেজ মহিলা গণিতবিদ
অ্যাডা লাভলেসের ছবি ঝুলানো ছিল।৷
স্পষ্ট মনে আছে আমার।৷
মেয়েটার সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, তার নাম জেনিথ স্মিথ, ব্রিটিশ পরিবারে তার জন্ম৷৷
বাসা কোথায় জিজ্ঞেস করাতে, বললো পার্ক স্ট্রিটের আশেপাশেই থাকছে আপাততঃ।৷
আর বেশিকিছু জিজ্ঞেস করলাম না,
অপরিচিত মেয়ে, তাও আবার বিদেশি।৷ কি না কি ভেবে বসবে, কে জানে!!!!
পার্ক সিমেট্রি দেখতে দেশী-বিদেশী অনেকেই ভিড় জমায় ৷৷
মেয়েটাও হয়তো এ কারণেই এসেছে৷৷
ভালোই হয়েছে, কথা বলার জন্য একজন সঙ্গী পেলাম৷৷
হাঁটতে হাঁটতে , একপশলা বাক্যালাপ হয়ে গেলো।৷ খেয়াল করলাম, মেয়েটির কথাবার্তায় বেশ সাহিত্যিক সাহিত্যিক ভাব আছে।
সাহিত্যে বেশ পারদর্শী হয়তঃ ।৷
ইংরেজ কবি চসার ও শেকসপিয়ার সম্পর্কে বিশুদ্ধ ইংরেজিতে অনর্গল বলে গেলো।৷
আমার আবার সাহিত্যে খুবই আগ্রহ৷৷
কথাবার্তা চালিয়ে নেওয়ার মত, ভাঙাচোরা ইংরেজি আমিও পারি।৷
কবি ইয়েটস, এলিয়ট সম্পর্কে বলতে থাকলাম আমি৷৷
ইয়েটস এর কথা জেনিথ’কে বললাম, তিনি নোবেল পুরষ্কারজয়ী রবি ঠাকুরের গ্রন্থ “song offerings ” এর প্রশংসাসূচক মুখবন্ধ লিখেছিলেন, সেটা বললাম জেনিথকে ৷
কবি এলিয়টের সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাক্ষাৎ হয়েছিলো, বেশ ভালো বন্ধুত্ব ছিলো তাদের, সেটাও বললাম।৷
কিন্তু,বড়ই আশ্চর্যের বিষয়, মেয়েটা সবকিছু শুনে অপ্রস্তুত হয়ে বললো,
ইয়েটস, এলিয়ট, রবি ঠাকুরের ঘটনাগুলো তার জানা নেই, কখনো শোনা হয়নি৷৷
বেশ অবাকই হলাম।৷ যে মেয়ে চসার, শেকসপিয়ার সম্পর্কে বেশ ভালোভাবেই জানে,
সে নাকি বিশ্বকবি ও তার ইংরেজ বন্ধু কবিদের নাম জীবনেও শুনে নি – – –
এ কেমন অদ্ভুত কথাবার্তা !!!
বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে।৷ সামনের দিকটা বেশ অন্ধকার।৷
মাঝে মাঝে গাছের পাতা ভেদ করে, একআধটু আলো প্রবেশ করছে।৷ তাতে যেন অন্ধকার আরো গাঢ় হয়ে, জমাট বাঁধছে।৷
পুরো সিমেট্রি ঘুরতে কতক্ষণ লাগবে, কে জানে।৷
ঘড়িতে সময় দেখতে গিয়ে খেয়াল করলাম, ঘড়িটা বন্ধ হয়ে আছে, ঘড়ির কাঁটাগুলোও স্থির।৷
যাহ বাবা!!!! বন্ধ হওয়ার আর সময় পেলো না।৷
জেনিথের পাশে হাঁটতে হাঁটতে ক্যামেরাতে ক্লিক ক্লিক করে চারপাশের ছবি তুলে নিচ্ছিলাম।৷
মেয়েটার হাতে অবশ্য কোনো ক্যামেরা, বা মোবাইল দেখতে পেলাম না।৷
হঠাৎ কি যেন মনে হলো, জেনিথকে অনুরোধ করে, তার একটা ছবি নিজের ক্যামেরা দিয়ে ক্যাপচার করে নিলাম।৷
ভাবলাম, অনেক কথাই তো হলো,
তারপরও অপরিচিত এক বিদেশিনী’কে ছবি তুলতে বলাটা কেমন দেখায়!!!
খারাপ উদ্দেশ্যের বশে তো নয়,
জেনিথের একটি ছবি স্মৃতি হিসেবেই আমার কাছে থেকে যাক না হয়।৷
দোষ কি তাতে!!!
যাই হোক, সৌভাগ্যবশতঃ, জেনিথ অমত করেনি।৷ গ্যালারি চেক করে দেখলাম, বেশ সুন্দর এসেছে ছবিটা।৷
জেনিথ অবশ্য অবচেতন মনে কি যেন ভাবছে।৷
হাঁটতে হাঁটতে আরেকটু সামনে এগুতেই মনে হলো,
সাদাটে কিছু একটা যেন সামনের রাস্তা থেকে আবছাভাবে সরে গেলো, অকল্পনীয়
দ্রুতগতিতে,
হঠাৎ করে গা ছমছম করে উঠলো।৷
চমকে উঠে ভাবলাম, দৃষ্টিবিভ্রম নাকি।৷
ভয়ের শিহরণ বয়ে গেলো শরীরজুড়ে ।৷
এমনিতেও এদিকটায় বেশ অন্ধকার প্রতিপন্ন হচ্ছে৷ ।
চারপাশের গাছগুলোর পাতা, ডাল বাতাসে আন্দোলিত হচ্ছে৷
এমন, স্যাঁতসেতে পরিবেশে ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক।৷
ঠিক এমন সময় জেনিথ হঠাৎ আমার হাত’টা শক্ত করে চেপে ধরে সামনে এগোতে বাঁধা দিলো।৷ এক মুহূর্তের জন্য অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম।
মেয়েটি চারপাশে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো, “এই জায়গাটা ভালো না।৷ এখানে অশুভ আত্মারা বাস করে।৷
আপনার ক্ষতি করতে পারে এরা।৷ আপনি চলে যান৷৷ আমি একটু পর আসছি।৷ ”
ভয়ের ধাক্কা সামলে, একটু হাসার চেষ্টা করলাম৷

ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলাম, “এখানে আত্মা থাকে, সেটা আপনি কিভাবে জানলেন???
তাছাড়া, দুইজন একসাথে এসেছি, আপনাকে একা ফেলে যাওয়া তো ঠিক হবে না ”
এরপর মেয়েটি রেগে গিয়ে ইংরেজি ভাষায় অকল্পনীয় জোরগলায়, রুক্ষভাবেই চিৎকার করে উঠলো,
“সেটা আপনার জানার কোনো প্রয়োজন নেই।৷
বেশি জানা’টা ঠিক না।৷ আর একটাও প্রশ্ন নয়।৷
আপনাকে ফিরে যেতে বলেছি, ব্যস, বিদায় হোন এবার ।
জাস্ট এতটুকুই বলবো, ভালো চান তো বিদায় হোন।৷ ”
কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে এত রুক্ষ, উদ্ধত ব্যবহার দেখে প্রবল ধাক্কা খেলাম যেন।৷ মন ভীষণভাবে খারাপ হয়ে গেলো হঠাৎ।৷
একটু আগেও তো বেশ বিনয়ী, ভদ্রোচিত ব্যবহার পেয়েছিলাম মেয়েটির কাছ থেকে।৷
নিজের আত্মসম্মান আর ইগোকে সবকিছুর থেকে বেশি প্রাধান্য দেই আমি৷৷
তার উপর, এক বিদেশিনীর কাছ থেকে এমন অপমানসূচক, রুক্ষ ব্যবহার মানতে পারলাম না কেন যেন৷৷
জেনিথ ইংরেজসুলভ হ্যান্ডশেক করে, বিদায় জানালো আমাকে৷৷ তার হাতখানা বেশ শীতল ঠেকলো, এমনিতেও আশেপাশে বেশ জোরেশোরেই শীত পড়া শুরু হয়েছে৷ বাতাসে গা কাঁটা দিয়ে উঠলো।৷
বিদায়বেলায়, হাসিমুখে ইংরেজিতে শেকসপিয়ারের একটা কবিতার উদ্ধৃতাংশ ফিসফিসিয়ে শুনিয়ে দিলো সে,
“All the world’s a stage,
And all the men and women merely players;
They have their exits and their entrances”
অবাক হলাম, এই কবিতাটা আমার খুবই প্রিয়- – এটা তো আমি তাকে একবারও বলিনি !!!
যাই হোক, বিদায় নিয়ে হাট করে, হাঁটা শুরু করে দিলাম।৷ অপমানে আর পিছনে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করিনি৷৷
কিছুক্ষণ হাঁটতেই দেখলাম, সিমেট্রি’র দু’জন গার্ড বেশ ব্যতিব্যস্ত হয়ে এদিকে আসছে।৷
আমাকে দেখে একজন বললো,
“স্যার, এই জায়গাটা একদমই ভালো না৷৷ এখানে রাতের বেলা প্রেত’রা জেগে উঠে।৷
অনেক গার্ড’ই এর সাক্ষী।৷
এখন প্রায় পাঁচটা, তাও শীতের বিকেল৷৷
সব দর্শনার্থী তো চলে গেছে।৷ আমাদেরও সিমেট্রি বন্ধ করে দিতে হবে এখন।৷
আপনি একা একা এখানে অন্ধকারে কি করছিলেন এতক্ষণ ??!!!”
ঘড়ি’র দিকে তাকালাম, একটু আগের বন্ধ ঘড়িটা যেন জাদুবলে আবার চলতে শুরু করেছে।৷
একটা সিমেট্রি ঘুরতে প্রায় দুই ঘন্টার মত সময় কাটিয়ে দিয়েছি এখানে!!!!
তবে কি ঘোরের মধ্যে ছিলাম!!!
এতক্ষণ যে কেটে গেছে, একদমই বুঝতেই পারিনি।৷
গার্ডদের’ জানালাম, একটা ইংরেজ দর্শনার্থী মেয়ে ভিতরে রয়ে গেছে,
তারা অবাক হয়ে,বারবার মাথা নাড়িয়ে বললো, “না স্যার, আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে,
আজকে কোনো ইংরেজ মেয়েকেই ঢুকতে দেখিনি আমরা৷৷ ”
পুরোদস্তুর থমকে গেলাম এবার, নিজের চোখকে অবিশ্বাস করবো কি করে!!!!
তাহলে, কি এতক্ষণ জেগে জেগে স্বপ্ন দেখেছিলাম৷৷ সেটাই বা কিভাবে সম্ভব!!!
মনের সাথে কোনোভাবেই বোঝাপড়া করতে পারছি না।৷
হঠাৎ করে চোখ পড়লো একটু দূরেই একটা অদ্ভুত সুন্দর সমাধিফলকের উপর, যেটা আগে কখনো দেখেছি!!!
আমার স্পষ্ট মনে আছে,
সুন্দর, ব্যতিক্রমধর্মী,
গোলাপ ফুলের নকশা আঁকা সমাধিফলকটা পার হয়ে, কিছুদূর গিয়ে, যখন মাইগ্রেনের ব্যথায় কাতরাচ্ছিলাম, তখন জেনিথ যেন ভোজবাজির মতো করে, একরাশ স্বস্তি ও ভরসা নিয়ে, আমার সামনে উদয় হয়।৷
এখানটায় গাছপালা কম, তখনো সূর্যের আলো আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে।৷
স্পষ্ট দেখলাম,সুন্দর এপিটাফ’টিতে লেখা আছে,
“মিস জেনিথ স্মিথ,
জাতি-ইংরেজ,
জন্ম-১৭৪২,
মৃত্যু-১৭৭০।৷ ”
এ কি দেখছি আমি!!!!
তাহলে কি………… জেনিথের আত্মাই দেখা দিয়েছিলো আমাকে!!!!
চসার, আর শেকসপিয়ার তো ১৭৭০ সালের আগের কবি৷৷
কিন্তু, এলিয়ট, ইয়েটস, রবি ঠাকুর তো তার শতবর্ষ’পরের কবি।৷
এজন্যই হয়তো, ক্ষণজন্মা জেনিথের অতৃপ্ত আত্মা এখনো তার সমকালীন সত্তরের দশকের সাহিত্যজ্ঞান নিয়েই পড়ে আছে৷৷
কিন্তু, কিভাবে সম্ভব এটা……!!!!!
হঠাৎ করে মনে পড়লো,বিদায়বেলায় জেনিথের হাত’টা বেশ শীতল ঠেকেছিলো আমার কাছে!!!
জড়, নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম৷৷
গার্ড’ দুজন বললো, “স্যার, একটু পরেই সিমেট্রি বন্ধ করে দিতে হবে, চলুন হাঁটি। ।
অগত্যা, গার্ডদের সাথে হাঁটতে হাঁটতে,
কাঁপা কাঁপা হাতে চটপট, ক্যামেরার ফটো গ্যালারি চেক করে নিলাম।৷
অবাক হয়ে দেখলাম, যেই জায়গাটায় সাদা কিছু তড়িৎগতিতে সরে যাওয়ার চিহ্ন চোখে পড়েছিলো আমার, ছমছমে ভয়ের অনুভূতি হচ্ছিল,
ঠিক সেখানকার যতগুলো ছবি তুলেছি, সবগুলো ছবিই সাদাটে হয়ে ফেটে গেছে,না হয় ঘোলাটে হয়ে গেছে।৷
পরক্ষণেই, আরো অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম, জেনিথের যেই ছবিটি আমি ক্যামেরায় তুলে রেখেছিলাম,
সেটাও সাদাটে হয়ে অস্পষ্ট হয়ে আছে৷৷
অথচ, এর আগপর্যন্ত
তোলা বাকী সব ছবিই কিন্তু ঠিকঠাক, স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান৷৷
গার্ডদের সাথে হাঁটতে হাঁটতে পার্ক সিমেট্রি’র গেইটে এসে,
ক্যামেরাতে ক্লিক করে প্রবেশদ্বারের একটা ছবি তুললাম,
এবার তো বেশ ক্লিয়ার ছবি এসেছে৷৷
ক্যামেরা চেক করেও কোনোরূপ সমস্যা পেলাম না।৷
তবে কি…………… জেনিথের কথাই ঠিক???? !!!!!!!
ওই শেষ প্রান্তটাতে সত্যিই কি অশুভ আত্মার বাস???!!!!
সে কি ওখান থেকে ভৎর্সনা করে, তাড়িয়ে দিয়ে আমাকে প্রাণে রক্ষা করলো???!!!!
মনকে কোনোভাবেই প্রবোধ দিতে না পেরে,
শেষ চেষ্টা হিসেবে,
গেইটের সিকিউরিটি গার্ড’দের অনেক বলে কয়ে, অনুরোধ করে আজকের এন্ট্রি বুক’টা চেক করালাম৷
স্পষ্টতই দেখছি, সেখানে জেনিথ বা ইংরেজ বংশোদ্ভূত কোনো মেয়ের নামই নেই!!!!
পরে, অবশ্য অনেকের মুখেই শুনেছি, সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রি’তে
বেড়াতে এসে এবং ছবি তুলতে গিয়ে,
সাদাটে অবয়ব দেখে অনেক পর্যটকই ভয় পান, অসুস্থ হয়ে পড়েন।৷
অনেকেরই অ্যাজমা, মাথা ব্যথার প্রকোপ বেড়ে যায় এখানে এসে৷৷
ছমছমে, অপ্রাকৃত অনুভূতির স্বীকার হন অনেক পর্যটক।৷
কারণস্বরূপ জানা যায় যে, এই সমাধিক্ষেত্রে এখনো কয়েকশো বছরের পুরোনো অতৃপ্ত আত্মাদের আক্ষেপ আর বিলাপ,
নেগেটিভ এনার্জিরূপে এখানে আসা পর্যটকদের শরীর, মনকে অসুস্থতা, হতাশা আর বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন করে তোলে।৷
পার্ক স্ট্রিটের আশপাশের স্থানীয় লোকজনও খুব সকালে ও সন্ধ্যার পর তাঁদের ঘরের জানালা বন্ধ করে রাখেন। অনেক জিজ্ঞেস করেও,তাদের কেউ সদুত্তর দিতে রাজি হন নি৷৷
সিমেট্রি’র প্রবেশদ্বারের লাইটটিও নাকি কিছুদিন পর পর, অজানা কারণে নষ্ট হয়ে যায়, পাল্টাতে হয়।৷
এখনো যখন গভীর নিশীথে একাকী ঘরের বারান্দায় বসে সেদিনকার কথা ভাবি, বাতাসের তীব্র ঝাপটায় হঠাৎ হঠাৎ চমকে উঠি।৷
বিশ্বাস, অবিশ্বাসের বাইরে গিয়ে,
জেনিথের আত্মার সদ্গতি কামনা করি।৷
অনন্ত, অসীম আকাশের দিকে তাকিয়ে, অজান্তেই আপন মনে বলে উঠি,
“ইয়া আল্লাহ্, সকল পরলোকগত আত্মাকে শান্তি প্রদান করুন। ”
আমিন ।।

138 total views, 12 views today

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here