পুরুষদের যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কে যা জানা জরুরী

0
41

আমাদের সমাজে পুরুষদের যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলাকে অসৌজন্য বা লজ্জার ব্যাপার হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু পুরুষদের এমন অনেক যৌন সমস্যা বা অবস্থা থাকে যেগুলোর জন্য জীবনের কোন না কোন সময়ে তাকে ভুগতে হয়। Erectile Dysfunction বা লিঙ্গের উত্থান জনিত সমস্যা এমন একটি অবস্থা। ভয়, হীনমন্যতা, লজ্জা ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে এসব সমস্যা লুকিয়ে রেখে হতাশায় জীবন যাপন করেন অগণিত পুরুষ। আবার ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়াকেও বাড়াবাড়ি মনে করেন অনেকে।

লিঙ্গ জনিত এই সমস্যার সমাধান ঘরোয়া ভাবেই করা সম্ভব। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শারীরিক থেকে মানসিক ও জীবন যাত্রার প্রভাব এই সমস্যার জন্য দায়ী হয়।

লিঙ্গের উত্থান জনিত সমস্যা কী?

এ রোগ ED (Erectile Dysfunction) / ধ্বজভঙ্গ বা যৌন মিলনে অক্ষমতা (Impotence, Sexual Impotence) এবং পুরুষাঙ্গের উত্থান জনিত ব্যাধি (Male Erectile Disorder) নামেও পরিচিত।

ED অনিয়মিতভাবে দেখা দিলে তা কোনো চিন্তার বিষয় না। তবে এ সমস্যা বারবার দেখা দিলে অবশ্যই বুঝতে হবে এটি কোনো গুরুতর রোগের লক্ষণ এবং পুরুষদের যৌন স্বাস্থ্য এর ফলে হুমকির মুখে পড়তে পারে। এক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

লিঙ্গের উত্থান জনিত সমস্যার কারণ কী?

পুরুষের যৌন উত্তেজনার সৃষ্টি একটি জটিল প্রক্রিয়া এবং এই প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্ক, হরমোন, রক্তবাহী নালী, স্নায়ু, মাংসপেশী, আবেগ ও অনুভূতি সব একসাথে কাজ করে। এগুলোর মধ্যে একটিতেও অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে পুরুষাঙ্গ উত্থানে এবং পুরুষদের যৌন স্বাস্থ্য জনিত সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

শারীরিক ও মানসিক অসুস্থার জন্য এই সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং দুশ্চিন্তা ও অন্যান্য মানসিক অসুস্থার জন্য এ সমস্যার আরও অবনতি হতে পারে। নিম্নে এ রোগের কারণগুলো আলোচনা করা হলোঃ

শারীরিক কারণ

যেসকল শারীরিক সমস্যার ফলে লিঙ্গের উত্থান জনিত সমস্যার কারণে পুরুষদের যৌন স্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ে তা হলঃ

  • হৃদরোগ।
  • Atherosclerosis বা রক্তনালী বন্ধ হয়ে যাওয়া।
  • রক্তে কোলেস্টরলের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া।
  • ডায়াবেটিস।
  • অতিরিক্ত মেদ।
  • একই সাথে কয়েকটি লক্ষণ (উচ্চ রক্তচাপ, ইনসুলিন ও কোলেস্টরলের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া এবং কোমরের কাছে মেদ জমা) দেখা দেওয়া (Metabolic Syndrome)।
  • পারকিনসন রোগ।
  • টেসটোস্টেরনের পরিমাণ কমে যাওয়া ।
  • পেরোনিজ ডিজিজ (Peyronie’s disease)
  • নির্দিষ্ট কিছু ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ।
  • তামাকের ব্যাবহার ।
  • মদ্যপান ও অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার ।
  • প্রোস্টেট (Prostate) বড় হয়ে গেলে/ ফুলে গেলে বা প্রোস্টেট ক্যান্সারের জন্য চিকিৎসা করানোর ফলে ।
  • কোনো অপারেশন বা আঘাতের জন্য শ্রোনীচক্র (Pelvic) ও স্পাইনাল কর্ডের কোনো ক্ষতি হলে ।

মানসিক কারণ

যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে আমাদের মস্তিষ্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বিভিন্ন মানসিক সমস্যার জন্যও এ রোগ দেখা দিতে পারে। যেমনঃ

  • হতাশা, দুশ্চিন্তাসহ অন্যান্য মানসিক অশান্তি থাকলে হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ এবং অবসাদ বেড়ে যায়, যা আপানার যৌন জীবনে প্রভাব ফেলে।
  • মানসিক চাপ।
  • সুম্পর্কের অভাব বা সম্পর্কে টানাপোড়েন।
  • আপনি আপনার সঙ্গীর যৌন চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না এই ভয় আপনার শারীরিক সমসস্যার জন্য দায়ী হতে পারে।
  • আপনার মানসিক অবস্থা আপনার যৌন জীবনের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলে। মানসিকভাবে হাসিখুশি না থাকলে যৌন উত্তেজনাও কমতে শুরু করে।
  • অনেক সময় যৌনতার ব্যাপারে মানুষ উদাসীন হয়ে পড়ে। সে সময় এ ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।
  • লিঙ্গের উত্থান জনিত সমস্যা দেখা দিলে ব্যক্তি আরও বেশি আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েন। অথবা প্রথম বার যৌন সম্পর্ক স্থাপন করার সময় ব্যক্তি ভয় বা দুশ্চিন্তার কারণে লিঙ্গের উত্থান জনিত সমস্যার সম্মুখীন হন।

কোন কোন বিষয়গুলো এই রোগের ঝুঁকি বাড়ায়?

বয়স বাড়ার সাথে সাথে পুরুষাঙ্গের উত্থান ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং এটি দৃঢ় হতে বেশি সময় নেয় ও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। তবে শুধুমাত্র বয়সের কারণেই এ সমস্যাটি হয় না। বয়সের সাথে সাথে অন্যান্য শারীরিক সমস্যা ও ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলেও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ রোগের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো হলঃ

  • লিঙ্গের উত্থান ক্ষমতা যেসকল স্নায়ু বা নার্ভের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় সেগুলো কোনো আঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হলে এ রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
  • নির্দিষ্ট কিছু ঔষধ যেমনঃ এ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট (Antidepressants), এ্যান্টিহিসটামিন (Antihistamines) এবং উচ্চ রক্তচাপ, ব্যাথা ও Prostate ক্যান্সারের জন্য যেসকল ঔষধ দেওয়া হয় তা ব্যবহারের কারণে এ রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
  • মদ্যপান ও মাদক সেবনের জন্য এ রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
  • দীর্ঘদিন সাইকেল চালানোর জন্য স্নায়ু সংকুচিত হয়ে যায় এবং লিঙ্গে রক্তপ্রবাহ কমে যায়। যার ফলে কিছু সময়ের জন্য লিঙ্গের উত্থান ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

ED এর জন্য যে ঔষধ দেওয়া হয় তাতে কি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে?

ভায়াগ্রা (Viagra) এবং এই ধরণের ঔষধের সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হল মাথাব্যথা যা ১৬ শতাংশ ব্যবহারকারীর মধ্যে দেখা যায়। ১০ শতাংশ ব্যবহারকারীর রক্তচাপ কমে যায়, মাথা ঝিমঝিম করে ও মুখে লাল ভাব দেখা দেয়। ১০ শতাংশ ব্যবহারকারীর খাবার হজমে অসুবিধা দেখা দেয়। ১০ শতাংশ ব্যবহারকারীর নাক বন্ধ হয়ে যায়। Viagra ব্যবহারকারীদের মধ্যে কারও কারও দৃষ্টি সমস্যা দেখা দেয়। এসব ঔষধের প্রভাবে পুরুষদের যৌন স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এ রোগের ক্ষেত্রে সার্জারি করা কতটা প্রয়োজনীয়?

পূর্বে এ রোগের শুধুমাত্র একটিই চিকিৎসা ছিল আর তা হল অপারেশনের সাহায্যে লিঙ্গের মধ্যে প্রোসথেটিক ডিভাইস স্থাপন করা। তবে এখন ঔষধের সাহায্যে এ রোগের চিকিৎসা সম্ভব এবং ঔষধের সাহায্যে চিকিৎসা সম্ভব না হলে শুধুমাত্র তখনই অপারেশন করা হয়। শুধুমাত্র একজন রেজিস্টার্ড ডাক্তারই নির্ধারণ করবে আপনার ঔষধ খাওয়ার বা সার্জারি করার প্রয়োজন আছে কিনা।

হেলথ টিপস্

  • ব্যায়াম করতে হবে বা ওজন নিয়ন্ত্রনে রাখতে হবে।
  • ধূমপান ত্যাগ করতে হবে।
  • মদ্যপান এড়িয়ে চলতে হবে।
  • পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতে হবে।
  • রক্তচাপ ও কোলেস্টরলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রনে রাখতে হবে।
  • দুশ্চিন্তা কমিয়ে আনতে হবে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে হবে, (রাতে কমপক্ষে ৭ ঘন্টা) ।
  • তরমুজের জুস খেতে পারেন।
  • বেদানা বা ডালিমের জুস উপকারী।
  • হীনমন্যতায় ভুগবেন না।
  • কাছের মানুষের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলুন।

পুরুষদের যৌন স্বাস্থ্য ঠিক থাকার পিছনে মানসিক অবস্থার প্রভাব উল্লেখযোগ্য। লিঙ্গের উত্থান জনিত সমস্যা খুব-ই সাধারণ। শতকরা ৯০% মানুষ এই বিষয়টি নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন, বিষয়টি চেপে যান এবং লজ্জায় সঙ্গীর সাথে আলোচনা করেন না। জ্বর হলে আপনি যেমন ডাক্তারের কাছে যান, সঙ্গীর সেবা শুশ্রূষা নেন, তেমনি এই ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রেও আপনাকে কথা বলতে হবে; আপনার সঙ্গীর সাথেই কথা বলতে হবে। উপরে উল্লিখিত ঘরোয়া নিয়ম কানুন মেনে এবং মানসিক অবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে সহজেই লিঙ্গের উত্থান জনিত সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।

159 total views, 6 views today

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here